সন্দীপন চক্রবর্তী

ডাকঘরের সেতু


পৃথ্বী বসু আর ঋক অমৃত দুই বন্ধু। ২২-২৪ বছরের দুই যুবক। দুজনেরই প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছে কয়েক মাস আগে, একসঙ্গে, একই প্রকাশনা থেকেদুটি বই-ই সুদৃশ্য। তবে দুটিরই দাম তাদের আয়তন বা মুদ্রণ-আয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি।

পৃথ্বীর বইয়ের শুরুতে, প্রবেশক কবিতাতেই, আমরা শুনি শান্ত এক স্বর -- ‘দু-জনেই জলে আছি, শুধু কোনো হাবুডুবু নেই’ অথবা ‘খেয়ালও করিনি স্রোত আমাদের কোথায় পাঠাল’। এখন প্রশ্ন জাগে যে, ‘আমাদের’ এই ‘দু-জন’ কে কে? তার কবিতায় বারবার ঘুরেফিরে আসে যে আমি আর তুমির কথা, তারা কি একই অস্তিত্বের দুই অংশ? নিজেকেই নিজে দূর থেকে দেখা? যেভাবে মানুষ নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলে, ভালবাসাবাসি করে, অভিমান করে, সেইরকম? অথচ তাদের একজন আরেকজনের ভিতর সেঁধিয়ে যায় নিয়ত। ‘আমি’ তখন বলতে পারে, ‘তোমার ভিতরে থাকি’। বলতে পারে, ‘তোমার ভিতরে ঢুকে, আস্তে আস্তে আমি / জেগে থাকা অভ্যেস করেছি’। এমনকি ‘তোমার উপরে উঠে, তোমাকেই দেখেছি আবার’। অথচ সে তার অন্য একটি পাখি ‘তুমি’-কে আড়াল করে রাখতে চায় – ‘পাছে কেউ দেখে নিচ্ছে শুধু এই ভয়ে / বাড়ির ভিতর তাকে প্রতিবার আড়াল করেছি’। ‘তুমি’ কি তাহলে ‘আমি’-রই ছায়া? কারণ সেই ‘তুমি’-র উপরেও থাকে তার অধিকারবোধ – ‘যেখানেই ছায়া দেখি, অধিকারবোধ জেগে ওঠে’। কে কার ভিতরে থাকে তাহলে? সে তো জানে যে, আমার এই অস্তিত্ব আসলে ‘তোমার ভিতরে ফাঁকা চায়ের বাগানে / শ্রমিকের মতো বেঁচে থাকা’। আর তার থেকেই জেগে ওঠে অভিমান। জেগে ওঠে ভয়। জেগে ওঠে দূরত্ব। আবার একইসঙ্গে জেগে ওঠে তার কাছে ফিরে আসার ইচ্ছা – ‘এই যে ফেরত আসা, একে ভয় নিয়ন্ত্রণ করে / এই যে চুক্কি দিই, সেটা ইচ্ছাকৃত’ এবং সে জানে ‘যেদিন আর পারব না, / আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে’। সে জানে, ‘এখন যেসব স্মৃতি, কত না সুখের মনে ক’রে / তোমাকে পাঠাতে গিয়ে, দেখি তুমি প্রতিযোগী ভাবে / আমার কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সেসব স্মৃতি / ফেরত পাঠাও’। আর এখানে, এই জায়গায় এসে যেন ‘আমি’ আর ‘তুমি’ একাকার হয়ে তৈরি করে তোলে এক জটিল মুখ, এক তৃতীয় সত্তাটের পায় – ‘আমার আজ চোখে পড়ছে, অন্য কারো নামার প্রস্তুতি...’। পৃথ্বীর লেখার শান্ত, জ্বরতপ্ত আর নিবিড় এক স্বরের মানচিত্র জুড়ে জলপটির মতো যেন ‘দিনক্ষণ পড়ে থাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে’। সে টের পায়, ‘জলের গভীরে যেন জমা পলিমাটি আমি, / একা’। আর একা-একাই দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই শহরের জীবনকে, তার মানুষগুলোকে, তাদের মধ্যেকার সম্পর্কগুলোকে শান্তভাবে দেখে যায় শুধু সে‘নির্মোহ বেঁচে থেকে, যেন স্থির জীবনকে দেখা... / পুরোনো বাড়ির মতো একা’। এভাবেই তৈরি হয়ে ওঠে তার কবিতার সত্য, যেখানে জেগে ওঠে এই বোধ – ‘চাওয়ার অভ্যেস হলে, বড়ো বেশি লোভ বেড়ে যায় / বড়ো বেশি পাওয়া হলে, মানুষ আর ভিখারি থাকে না’।
                                                                                                                     পৃথ্বী বসু











 




















অথচ আমাদের অস্তিত্ব আর আমাদের শিল্প মানেই তো জীবনের কাছে ভিখারির মতো হাত পেতে দাঁড়ানো। তাই তার সঙ্গে নিঃশব্দে তৈরি হওয়া এক বিনিময়পথের রেখা জেগে ওঠে পৃথ্বীর লেখায় তৈরি হয়ে ওঠে ‘আমার জটিল মুখ’-এর জ্যামিতি সে ক্রমশ টের পায়, ‘নিজের ভিতরই কবে ঢুকে গেছে কাঁটাতার, নদী -- / ওইপারে যেতে বাধা। সারাক্ষণ অনুভব করি / তোমার ভিতরে যত মনখারাপ, অভিমান আছে / নিজের স্বভাবে আজ ওটুকুও পেরোতে পারি না’। কিন্তু মাঝেমাঝে পাল্টেও যায় পরিস্থিতি। যখন, ‘আমাকে কবিতা ছোঁয়, আমাকে পাথর করে রাখে / তারপর তুমি ছুঁলে, পাথরের মাঝখানে জল / তোমার শরীরে আমি জল হয়ে ঢুকে পড়ি। নদী -- / তখন কবিতা ছুঁলে, নদী বানভাসি। জল বাড়ে’। একদিকে এই বানভাসি, আর আরেকদিকে একইসঙ্গে টের পাওয়া যায় ‘বোধের শ্মশানে তুমি পড়ে থাকা চেতনার হাড়’। এ দুয়ের টানাপোড়েনে তখন ‘বুকে দ্রুত বীণা বাজে। ঝরে যায় হাঁসের পালক / খইয়ের ভিতরে ওড়ে শোক’। তখন শুধু মনে হয় – ‘আমার জটিল মুখ কার কাছে গেলে এই বেলা / হাসি ফিরে পাবে আর পাবে কিছু ময়ূরের নাচ’। তখন আলতো করে বলা যায়, ‘যেটুকু যা বলি শুধু : যত পারো সরে এসো কাছে / যন্ত্রণা থাকবেই। আছে...’। অথচ একইসঙ্গে থেকে যায় আক্ষেপ আর অভিমানাহত স্বর – ‘সামান্য আশ্রয় তুমি দিতে পারতে হাতের তালুতে / সামান্য আশ্রয় তুমি দিতে পারতে চোখের পাতায় / তোমার দুঃখের দিন তুমি কেন একা একা যাবে?’ আর তাই, পাঠককেও সঙ্গে নিয়ে চলতে শুরু করে এই কবিতা। যেন তাকে মনে করিয়ে দেয় ‘সুধা তোমাকে ভোলেনি’। তৈরি হয়ে ওঠে এই নামের একটি কবিতাসিরিজ-ওযদিও তার ‘খইয়ের ভিতরে ওড়ে শোক’, তবু সে শান্তভাবে বলতে পারে, ‘তোমার অপমান আমি এতদূর লুকিয়ে এনেছি। ছেড়ে চলে যাওয়াটুকু, কাউকেই দেখতে দিইনি’।

ভিতরের এই জমে থাকা কান্না, রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকের সূত্র ধরেই, যেন তৈরি করে তোলে এক সেতু। ঋক অমৃত ওরফে অমৃতনাথ ভট্টাচার্যের বইয়ের শুরুতেই তাই আমরা পড়ি – ‘আমরা যারা ছোটোবেলায় ডাকঘর পড়ে অকারণ কেঁদেছিলাম, বয়স বাড়ার পর একটি উন্মুক্ত জানলা ছাড়া আর কোনো সম্পত্তি নেই তাদের’। সেখানে দাঁড়িয়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শব্দমালাদের জিজ্ঞাসা করি, “তোমাদের তো আমি রূপ দিয়েছি। বদলে কী দিয়েছ ফেরত?” উত্তর আসে, “পরিচয়”।’ আর এই পরিচয় খোঁজার পথরেখাই ঋকের কবিতা। সে জানে, ‘সুতো আসলে একটি রাস্তা। অনেকটা / রাস্তা দিয়ে দর্জি জামা তৈরি করেন। / জঠর ফস্কে গেলে, আমরা এই জামার / ভিতরে এসে ঢুকি, আমাদের দ্বিতীয় ঘর। / পথ হারিয়ে যায়...’। মনে হয় ‘এ কেমন বোহেমিয়ান জীবন আমার বুঝি না, সারাদিন খালি আশ্রয় খুঁজে বেড়ানো’। আর তাই ‘নতুন কিছু প্রশ্ন দরকার শরীরে চমকে ওঠার’। সেসব প্রশ্ন খুঁজতে গিয়েই সে দেখতে পায় – ‘শুধু জেব্রার নয় / তোমার শরীরেও ডোরাকাটা দাগ / যেকোনো সবুজ সংকেতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে’। সে দেখতে পায় এক ‘লাল ফাঁস দিয়ে / ঝুলে পড়া দেশ’, যেখানে ‘ধূপের গন্ধ, স্রোতে ভেসে আসা / এতদিনের বিষণ্ণ নাভি সমাবেশ’। টের পায় ‘শিকড়ের সন্ধান আমাদের / এক ঝুরঝুরে অন্ধকারের দিকে / নামিয়ে এনেছে’। এ এমন এক সময়, যেখানে ‘একটি শার্পনার বিছানায় পড়ে / একের পর এক পেন্সিল / ছুলে নিচ্ছে ছেলেরা’ – এই দৃশ্য দেখেও আমাদের মনে পড়ে যায় ‘গণধর্ষণ’-এর কথা। ফলে দরকার হয় এক আড়াল। কিন্তু পৃথ্বী যেভাবে বলতে পারে, ‘পাছে কেউ দেখে নিচ্ছে শুধু এই ভয়ে / বাড়ির ভিতর তাকে প্রতিবার আড়াল করেছি’, তার থেকে অনেক আলাদাভাবে ঋককে বলতে হয় সেই একই কথা – ‘গোপনাঙ্গের মতো নিজেকে লুকিয়ে লুকিয়ে রাখি’। বা পৃথ্বী যখন বলে ‘যেখানেই ছায়া দেখি, অধিকারবোধ জেগে ওঠে’, ঋককে তখন বলতে হয় ‘প্রতিটা মানুষই তাদের ছায়ার / যমজ’। ফলে নিজের ছায়া, নিজের কবিতা এডিট করার সময়ে, শব্দদের উৎখাত করতে গেলেও, তারা পুনর্বাসন চায়। আর ‘ভিতরে ভিতরে এক / উদ্বাস্তু সমস্যা’ তৈরি হয়ে ওঠে তার। আর পুনর্বাসনে, নতুন জায়গায় এসে, একদিন সে দেখে ‘আমার যেকোনো পথ কলেজ স্ট্রিটের দিকে যায়। পুরোনো পার্টি অফিসে, সন্ধেবেলা, নতুন স্টোরিবোর্ডে অপেক্ষা করেন চ্যাপলিন’এবং আস্তে আস্তে সে নিজেই হয়ে ওঠে ‘কলেজ স্ট্রিটের চ্যাপলিন’।বোঝা যায়
                                                                                                                  ঋক অমৃত

তার ‘কলমের সাথে রক্তের সম্পর্কটা আসলে কতটা ঐতিহাসিক’। কারণ সে জানে, ‘যে শব্দ একবার কাগজে নেমে আসে, তা কলমে ফেরে না আর’। ফলে লেখার মধ্যে দিয়েও তৈরি হয়ে ওঠে ব্যক্তির ইতিহাস, তার ভাষার ইতিহাস। কিন্তু সমস্যা হলো ‘আসলে মানুষ যেভাবে মরে, ভাষা তো ঠিক মরে না সেভাবে’। তাই এখনও তার ‘দেহ ছুঁয়ে বসে থাকেন চণ্ডীদাস’। অথচ তাকে বেঁচে থাকতে হয় এই সমসময়েই। তাই স্বাধীনতার সত্তর বছর পরে, প্রত্যেকটি রাজ্যের কাছে একটি করে লাইন রাখা সত্ত্বেও, সে টের পায় ‘আমি লাইনগুলো জুড়ে একটা কবিতা / লিখতে পারছি না...’। বুঝতে পারে যে, এ এমন এক অবস্থান, যেখানে এসে মনে হয় ‘এখান থেকে রুখে দাঁড়ানোর নামই তো পালানো’। কিন্তু সময় থেকে, ইতিহাস থেকে, চাইলেই কি পালানো যায়? চ্যাপলিনও কি পেরেছিলেন পালাতে? নাকি পালানোই তখন পাল্টে যায় রুখে দাঁড়ানোয়? শাণিত বিদ্রূপে? ‘কলেজস্ট্রিটের চ্যাপলিন’ কী বলবেন এই বিষয়ে? জানতে হলে পড়ুন এ দুটি কবিতার বই।   

খইয়ের ভিতরে ওড়ে শোক। পৃথ্বী বসু। ভালো বই। ৫০টাকা। 
কলেজস্ট্রিটের চ্যাপলিন। ঋক অমৃত। ভালো বই। ৫০টাকা।

No comments

Powered by Blogger.